পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত
Bengal Times News, 22 June 2026
বেঙ্গল টাইমস নিউজ, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার আসনে এই প্রথম বিজেপির রাষ্ট্রবাদী সরকার। ২২ জুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেন। এই বাজেটকে সরকার "উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার বাজেট" হিসেবে তুলে ধরেছে। বাজেটে একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড়সড় DA বৃদ্ধি ঘোষণা হয়েছে, তেমনি মহিলা, কৃষক, যুবক-যুবতী, বেকার, অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক, ক্রীড়া ও শিল্পক্ষেত্রের জন্য একাধিক নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
১. মহিলা কল্যাণ : বাজেটের সবচেয়ে বড় ঘোষণা অন্নপূর্ণা যোজনা
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে "অন্নপূর্ণা যোজনা"-র জন্য। মোট বরাদ্দ ৩৬,০০০ কোটি। যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ আর্থিক সহায়তা। সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর। লক্ষাধিক পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।
সরকারের দাবি, এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে মহিলাদের জন্য সবচেয়ে বড় সরাসরি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি।
কারা উপকৃত হবেন :
ক. গৃহবধূ
খ. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলা
গ. স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা
ঘ. গ্রামীণ এলাকার মহিলারা
২. সরকারি কর্মচারীদের জন্য ঐতিহাসিক DA বৃদ্ধি
দীর্ঘদিনের DA আন্দোলনের পর বাজেটে বড় ঘোষণা করা হয়েছে।
নতুন ঘোষণা : DA ২০ শতাংশ বৃদ্ধি
মোট DA বেড়ে ৩৮% হয়েছে।
লক্ষাধিক রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী উপকৃত।
এটি বিজেপি সরকারের প্রথম বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৩. কর্মসংস্থান: -
১ লক্ষ সরকারি চাকরি - চাকরি সংক্রান্ত ঘোষণা। আগামী পর্যায়ে ১ লক্ষ সরকারি চাকরি।
১. শিক্ষক নিয়োগ
২. স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
৩. পুলিশ নিয়োগ
৪. প্রশাসনিক কর্মী নিয়োগ
দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের মাধ্যমে বেকারত্ব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বেকার যুবকদের জন্য "ভরসা কর্মসূচি"
বেকারদের জন্য নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
১. স্নাতক বেকারদের প্রতি মাসে ৩,০০০
২. অন্যান্য যোগ্য বেকারদের প্রতি মাসে ২,০০০
বয়সসীমা ২১–৪৫ বছর।
(আয়ের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা পরিবারই পাবেন এই সুবিধা।)
উদ্দেশ্য : চাকরি পাওয়া পর্যন্ত ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা। গ্রামীণ ও শহুরে বেকার যুবকদের সুরক্ষা প্রদান করাও এই প্রকল্পের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য।
৫. শিল্পনীতি ও বিনিয়োগ :
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূর্বেই নতুন শিল্পনীতি আনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
মূল বৈশিষ্ট্য :
অ. Single Window Clearance
আ. দ্রুত জমি বরাদ্দ
ই. শিল্পে কর ছাড়
ঈ. MSME-র জন্য বিশেষ প্যাকেজ
৫. বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ
লক্ষ্য :
ক. উৎপাদন শিল্প বৃদ্ধি
খ. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
গ. রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি
৬. অবকাঠামো উন্নয়ন
৪০,০০০ কোটির উন্নয়ন প্যাকেজের একটি বড় উন্নয়ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বর্তমান সরকার ।
এই প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত বিষয় সমূহ নিম্নলিখিত :
ক. রাস্তা
খ. সেতু
গ. শহর উন্নয়ন
ঘ. গ্রামীণ অবকাঠামো
ঙ. পানীয় জল
চ. ভাগীরথী নদীর উপর নতুন সেতু (বরাদ্দ: ১,২০০ কোটি)
ছ. উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ উন্নত হবে
জ. শিল্প ও বাণিজ্যিক পরিবহণ সহজ হবে
ঞ. কল্যাণী বিমানবন্দর (নতুন ঘোষণা - কল্যাণীতে নতুন বিমানবন্দর)
ট. উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার উন্নয়ন
ঠ. শিল্প ও পর্যটনে গতি
৭. কৃষি ও কৃষক কল্যাণ
কৃষিক্ষেত্রে কেন্দ্রের প্রকল্পগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য :
অ. ফসল বীমা সম্প্রসারণ
আ. কৃষিযন্ত্র ভর্তুকি
ই. সেচ প্রকল্প
ঈ. কৃষি বিপণন পরিকাঠামো
(প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বৃহৎ ফসল বীমা কর্মসূচির সূচনা করেছেন, যা রাজ্যের কৃষকদের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।)
৮. স্বাস্থ্যখাত
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির এক বিশাল ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ক. অগ্রাধিকার নতুন হাসপাতাল
খ. জেলা হাসপাতালের আধুনিকীকরণ
গ. ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ
ঘ. গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা
৯. শিক্ষা - গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এবং এই বাজেটের সবচেয়ে প্রধান দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অ. নতুন স্কুল অবকাঠামো
আ. শিক্ষক নিয়োগ
ই. প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা
ঈ. AI শিক্ষার প্রসার
AI মিশন - রাজ্যে Artificial Intelligence Mission চালুর ঘোষণা হয়েছে।
লক্ষ্য : প্রযুক্তি শিক্ষা, স্টার্টআপ গঠন, আইটি কর্মসংস্থান
১০. ক্রীড়া
নতুন স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি - সরকার একটি নতুন ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের ঘোষণা করেছে।
সম্ভাব্য সুবিধা :
অ. আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ
আ. খেলোয়াড় তৈরির অবকাঠামো
ই. স্পোর্টস সায়েন্স গবেষণা
১১. প্রশাসনিক সংস্কার - পাঁচটি নতুন জেলা
প্রশাসনিক পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ৫টি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব।
এর ফলে:
ক. দ্রুত প্রশাসনিক পরিষেবা
খ. জেলা সদর কাছাকাছি
গ. সরকারি কাজের গতি বৃদ্ধি
১২. সাংবাদিক কল্যাণ
নতুন পেনশন প্রকল্প এবং প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য পেনশন।
ক. সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল
এটি পশ্চিমবঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য প্রথম বড় আর্থিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলির একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
১৩. গ্রামীণ উন্নয়ন
প্রধান অগ্রাধিকার :
ক. গ্রামীণ রাস্তা
খ. পানীয় জল
গ. আবাসন
ঘ. কর্মসংস্থান
(কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।)
১৪. সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা খাত :
এই বাজেটের অন্যতম বিতর্কিত অংশ হল মাদ্রাসা শিক্ষার বরাদ্দে বড় কাটছাঁট।
মাদ্রাসা শিক্ষার বরাদ্দ প্রায় ৫০% কমানো হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
সরকার দাবি করেছে এই কাটছাট কৃত অর্থ অন্যান্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।
১৫. সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্য প্রকল্প
সরকার পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় বিশেষ প্রকল্প ঘোষণা করেছে।
বিশেষ গুরুত্ব :
১. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্মৃতি সংরক্ষণ
২. ঐতিহাসিক স্থাপনা উন্নয়ন
৩. সাংস্কৃতিক পর্যটন
এই বাজেটে সবচেয়ে বেশি লাভবান কারা ?
১. মহিলারা
৩,০০০ মাসিক সহায়তা - অন্নপূর্ণা যোজনা
২. সরকারি কর্মচারীরা - ২০% DA বৃদ্ধি
৩. বেকার যুবক-যুবতীরা - ভরসা কর্মসূচি
(১ লক্ষ চাকরির ঘোষণা)
৪. কৃষকরা - ফসল বীমা - কৃষি অবকাঠামো
৫. শিল্পোদ্যোগীরা - নতুন শিল্পনীতি - বিনিয়োগ সুবিধা
৬. খেলোয়াড়রা - স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি
৭. সাংবাদিকরা - পেনশন প্রকল্প
সার্বিক মূল্যায়ন :
২০২৬-২৭ সালের এই বাজেট মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে— মহিলা কল্যাণ, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬,০০০ কোটি বরাদ্দ, ২০% DA বৃদ্ধি, ১ লক্ষ চাকরির ঘোষণা, বেকার ভাতা, নতুন শিল্পনীতি এবং ৪০,০০০ কোটির উন্নয়ন প্যাকেজ—সব মিলিয়ে এটি বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটকে একটি উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নথিতে পরিণত করেছে। তবে এই সমস্ত ঘোষণা বাস্তবে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটাই আগামী এক বছরে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত :
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মত -:
“এই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি না হলে এত বড় ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হবে।”
শিল্পমহলের মত :
“নতুন শিল্পনীতি এবং দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মত :
“সেচ, কৃষিযন্ত্র এবং ফসল বীমা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে কৃষকদের সরাসরি আয় বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থার সংস্কারে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।”
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মত :
“নতুন জেলা, অবকাঠামো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সফল হলে প্রশাসনিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।”
২০২৬ সালে ‘উন্নয়ন ও সুশাসন’-এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে।
ইতিহাস বলছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আর শুধু ঘোষণা শুনতে চান না; তাঁরা ফলাফল দেখতে চান।
অন্নপূর্ণা যোজনা যদি সত্যিই লক্ষ লক্ষ মহিলার আর্থিক ক্ষমতায়ন ঘটায়, তবে তা রাজ্যের সামাজিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একইভাবে এক লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা বহু শিক্ষিত যুবকের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
যাইহোক, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন আজ নয়, আগামী কয়েক বছর পরে হবে। কারণ বাজেটের সাফল্য ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখন অপেক্ষা করছেন—বিধানসভার ভাষণ কতটা বাস্তবের মাটিতে নামতে পারে তা দেখার জন্য।



