মেধার আঙিনায় চাঁদের হাট : বর্ধমান সায়েন্স এন্ড নেচার ক্লাবের অনন্য প্রয়াস
Bengal Times News, 28 June 2026
বেঙ্গল টাইমস নিউজ, বর্ধমান : শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির পুণ্যভূমি বর্ধমান। যুগ যুগ ধরে এই শহর, বুকে ধারণ করেছে সারস্বত-সাধনার এক গৌরবময় ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে ২৮ জুন রবিবার বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলের রাজেন্দ্র ভবনে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকল পূর্ব বর্ধমানের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ কৃতি ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকরা। উপলক্ষ্য ছিল—‘বর্ধমান সায়েন্স এন্ড নেচার ক্লাব’ আয়োজিত কৃতী ছাত্র-ছাত্রী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
ঐতিহ্যের আবহে মঙ্গলাচরণ শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, চন্দনের ফোঁটা আর পুষ্পার্ঘ্যের স্নিগ্ধতায় অনুষ্ঠানের সূচনাতেই যেন এক পরম পবিত্র পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের উত্তরীয় ও মেমেন্টো দিয়ে বরণ করে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিতে তুলে দেওয়া হয় 'সবুজ প্রাণ'' বৃক্ষশিশু।
মঞ্চ আলো করে উপস্থিত ছিলেন বর্ধমান বাজেপ্রতাপপুর রামকৃষ্ণ মিশন এর সম্পাদক স্বামী অজ্ঞেয়ানন্দজী মহারাজ, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত ‘গাছ মাস্টার’ তথা গ্রীন ম্যান অফ বেঙ্গল অরূপ চৌধুরী, বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অরুনাভ চক্রবর্তী, বিশিষ্ট সমাজসেবী ও বিজেপির জেলা শিক্ষা সেলের কনভেনার দীপক মন্ডল, বিশিষ্ট সাংবাদিক জগন্নাথ ভৌমিক, বিশিষ্ট সমাজকর্মী অভিজিৎ নাগ।
অনুষ্ঠানের সূচনায় অদ্রিকা সাহার রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরমূর্ছনা উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে যায়। এরপর আকাঙ্ক্ষা সাহার সৃজনশীল নৃত্য এবং অতিথিদের মঙ্গলদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। শিক্ষার্থী ব্রতজিৎ দাসের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম এক আবেগঘন মুহূর্ত, যা সকলের হৃদয় ভরিয়ে দেয়।
বর্ধমান সায়েন্স এন্ড নেচার ক্লাবের সভাপতি বিশ্বরূপ দাস বলেন, "ছাত্র-ছাত্রীরা হল ফুল বাগানের ছোট ছোট গাছের মতো, আর শিক্ষকরা হলেন মালি। জলসিঞ্চনের মতো সঠিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান আর সঠিক দেখভালেই এই জীবন উদ্যানে সুন্দর পুষ্প ফুটে সৌরভ ছড়াবে।"
বর্ধমান সায়েন্স এন্ড নেচার ক্লাবের এদিনের মঞ্চে উপবিষ্ট গুণীজনদের অমূল্য বক্তব্য ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ পথের দিশা দেখায়। স্বামী অজ্ঞেয়ানন্দজী মহারাজ চরিত্র গঠন ও নিষ্ঠার পাঠ দেন। গাছ মাস্টার অরূপ চৌধুরী বৃক্ষরোপণের উপযোগিতার সাথে ‘মানুষের মতো মানুষ’ হওয়ার পরামর্শ দেন। বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শিক্ষা জেলা কনভেনার দীপক মন্ডল রাজ্য সরকারের শিক্ষানীতির আলোকপাতে ছাত্রদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। সাংবাদিক জগন্নাথ ভৌমিক জীবনমুখী শিক্ষার বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন এবং প্রধান শিক্ষক অরুনাভ চক্রবর্তী একটি বৃহত্তর মানবিক সমাজ গঠনের ডাক দেন।
এদিন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের মোট ৪১ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধিত করা হয়। তাদের হাতে শংসাপত্র, বই, মেমেন্টো, মিষ্টান্ন, কভার ফাইলের পাশাপাশি একটি করে ‘বৃক্ষশিশু’ উপহার দেওয়া হয়—যা মেধার সাথে প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
সংগঠনের সদস্য হিমাদ্রি শেখর দে জানান, এই ক্লাব শুধু একদিনের উৎসব নয়, বরং সারা বছর ধরে সমাজ ও পরিবেশ সেবার পাশাপাশি স্কুল টাইমের বাইরে অনলাইনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের নিখরচায় পঠন-পাঠনে সাহায্য করে চলেছে।
এদিনের সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতা ও নান্দনিকতার সাথে সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষক বিশ্বরূপ দাস। এছাড়া অলক বিশ্বাস, অমৃতপ্রসাদ দাস, অনিমেষ সাহা, মইনুদ্দিন সিদ্দিকী, নয়ন চক্রবর্তী, অয়ন কুমার মল্লিক, হিমাদ্রি শেখর দে, কুন্তল ঘটক, ধীমান মাল, মিঠুন রায়, বিশ্বনাথ দত্ত, স্বরূপ ঘোষ, রীতা মুখার্জী মণ্ডল, সূর্যদেব ঘোষ, সজল দে, রণজিৎ ঘোষ, রাঘব শ্যাম, অনুপম মুখার্জী সহ ক্লাবের একঝাঁক সক্রিয় শিক্ষক সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অনুষ্ঠানটি সাফল্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে, কচি-কাঁচাদের কলকাকলি আর বর্ধমানের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলের রাজেন্দ্র ভবন যেন সত্যিই এক টুকরো ‘চাঁদের হাটে’ পরিণত হয়েছিল, যার রেশ উপস্থিত সকলের মনে থেকে যাবে বহুদিন।









