Bardhaman Harisabha at Centenary
বর্ধমান হরিসভা : শতবর্ষের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ
Bengal Times News, 20 April 2026
জগন্নাথ ভৌমিক, বর্ধমান : শতবর্ষের আলোকে বর্ধমান হরিসভা। ইতিহাসের এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়। সেই পিছনে ফেলে আসা এক শতকের কিছু টুকরো স্মৃতিতে সমৃদ্ধ তথ্যের সংকলনকে আগামীর জন্য নথিভুক্ত করে যে 'স্মরণিকা' প্রস্তুত করা হয়েছে ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হলো।
এই উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন বর্ধমান শ্রী রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী দুর্গেশানন্দজী পুরী মহারাজ। এছাড়াও ছিলেন বর্ধমান উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারপার্সন উজ্জ্বল প্রামাণিক, শিবশঙ্কর চৌধুরী, পীরদাস মন্ডল, বর্ধমান হরিসভার সম্পাদক তথা শিক্ষাবিদ সুব্রত রায়, সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অচিন্ত্য কুমার দত্ত সহ অন্যান্য বিশিষ্টজন। অনুষ্ঠানটি সুন্দর ভাবে সঞ্চালনা করেন পৃষ্ঠপোষক কমিটির সদস্য শীর্ষেন্দু সাধু।
উল্লেখ্য এদিন সকালে শ্রীশ্রী শ্রীধর জিউয়ের ষোড়শোপচারে পূজা, শ্রীশ্রী গীতাপাঠ , শ্রীশ্রী চন্ডীপাঠ এবং পরে হোম ও তিলক দান এবং সন্ধ্যায় শ্রীশ্রী শ্রীধর জিউয়ের আরতি, শীতল ও প্রসাদ বিতরণ হয়।
এদিন সন্ধ্যায় বর্ধমান হরিসভা শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের আগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বর্ধমান শ্রী রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী দুর্গেশানন্দজী পুরী মহারাজ বলেন, বর্ধমান হরিসভার সনাতনী আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মযজ্ঞে উজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। তিনি চতুস্পাটি প্রসঙ্গে বলেন, এখান থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দুর্গেশানন্দজী পুরী মহারাজ উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, বিগত ও বর্তমান সরকারের উদাসীনতায় সংস্কৃত টোল শিক্ষা আজ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এবিষয়ে তিনি সরকারি আধিকারিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
বর্ধমান হরিসভার সম্পাদক সুব্রত রায় বলেন, বর্ধমান হরিসভার শতবর্ষপূর্তি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং এক গৌরবময় উত্তরাধিকার বহনের উজ্জ্বল অধ্যায়। একশো বছরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কেবলমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাস নয়, বরং সমাজ, শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনার এক সমন্বিত বিকাশের দলিল। এই শুভক্ষণে স্মরণিকা প্রকাশের মাধ্যমে আমরা ফিরে দেখতে চাই সেই প্রেরণার উৎস, যেখান থেকে বর্ধমান হরিসভার পথচলা শুরু হয়েছিল।
বর্ধমান রাজপরিবারের সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক বর্ধমান হরিসভার। মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের উদার পৃষ্ঠপোষকতা এবং জমি দান এই প্রতিষ্ঠানের বিকাশে এক দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে। তাঁর এই মহানুভবতা কেবল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল। বর্ধমান হরিসভা প্রতিষ্ঠার পর ক্রমশ গড়ে ওঠে বিভিন্ন মন্দির ও স্থাপনা-শ্রীধর জীউয়ের মন্দির, নাটমন্দির, ভজনমন্দির, হরিসভা সভাগৃহ তথা দুর্গামন্দির ও সূর্য স্মৃতি মন্দির। এই সব কটি স্থাপনা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। শ্রীধর জীউয়ের সেবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন উৎসব পালন, দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা এবং সাম্প্রতিককালে গণেশ পূজার আয়োজন এই প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় বহুমাত্রিকতার পরিচয় বহন করে।
শুধুমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষাবিস্তারেও বর্ধমান হরিসভার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হরিসভার চতুষ্পাঠীর প্রতিষ্ঠা এবং নারীশিক্ষার প্রসারে হরিসভা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সমাজে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এই উদ্যোগগুলি প্রমাণ করে যে, হরিসভা সর্বদাই সময়ের প্রয়োজনকে উপলব্ধি করে সমাজ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
পিছনে ফেলে আসা এক শতকের টুকরো টুকরো স্মৃতি দুই মলাটের মধ্যে ধরে রাখতে উদ্যোগী হয়েছে বর্ধমান হরিসভা। বর্ধমান হরিসভা শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন দুজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অচিন্ত্য কুমার দত্ত ও সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়। লেখকরা বিভিন্ন আঙ্গিকে শতবর্ষের তথ্য ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন। শতবর্ষের স্মারকগ্রন্থে লিখেছেন শিবশঙ্কর চৌধুরী, দুর্গাচরণ ভট্টাচার্য, মুরারি মোহন কুমার, নীহারকান্তি ঘোষ, সুব্রত রায়, সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়, রামপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়, সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অচিন্ত্য কুমার দত্ত, সত্যদাস ভট্টাচার্য, ডাঃ মৃন্ময় পাল, কৃষ্ণা কর্মকার, সুস্মিতা মোদক ও কৌশিক দাশগুপ্ত।
অনুষ্ঠান শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বর্ধমান হরিসভার অধ্যক্ষ দুর্গাচরণ ভট্টাচার্য।








