প্রসঙ্গ খুশীর ঈদ : বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের মানবতাহীন জীবন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক
ঢাকা, বাংলাদেশ
সদ্য শেষ হয়েছে খুশির ঈদ। তবে তার রেস এখনো কাটেনি বহু মানুষের কাছে। কেউ গ্রামে ঈদ কাটিয়ে পরিবার নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন। আবার অনেকেই ঢাকায় ঈদ উদযাপন করে একটু ফাঁকায় দেশ বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছেন। তবে এবারের ঈদ রেখে গেলো বেশ কিছু প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঈদ সবসময়ই ছিল আনন্দ, সম্প্রীতি আর মিলনের প্রতীক। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই চিরচেনা আনন্দ অনেকের জীবনে আজ যেন ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর বহু নেতা-কর্মীর জন্য এবারের ঈদ যেন উৎসবের নয়, বরং বেদনা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
একসময় যারা ঈদের আগমনে নিজ নিজ এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, গরিব-দুঃখীদের সহায়তা করতেন, ঈদের জামাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করতেন—আজ তাদের অনেকেই নিজ ঘরেই নিরাপদ নন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় কেউ কারাগারে, কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ মামলা-হামলার ভয়ে আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে ঈদের সেই চিরচেনা হাসি আজ তাদের ঠোঁটে অনুপস্থিত।
ঈদ মানে তো পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, নতুন কাপড়, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা, কোলাকুলি আর ভালোবাসার উচ্ছ্বাস। কিন্তু যে কর্মীটি বছরের পর বছর দলকে সময় দিয়েছেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন, মানুষের দুঃখে পাশে থেকেছেন—তিনি আজ হয়তো ঈদের দিনটিতে সন্তানের মুখটিও দেখতে পারছেন না। মায়ের হাতের রান্না, বাবার স্নেহমাখা দোয়া—সবই যেন দূরের স্মৃতি হয়ে গেছে।
অনেক পরিবারে ঈদের দিনেও নীরবতা নেমে এসেছে। মা অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য, স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর জন্য, সন্তানেরা অপেক্ষা করছে বাবার জন্য—কিন্তু কেউই ফিরছেন না। কারণ তাদের বিরুদ্ধে মামলা, তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা, কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা তাদের ঘরে ফেরার পথকে কঠিন করে তুলেছে। এই অপেক্ষা, এই অনিশ্চয়তা—এটাই যেন তাদের ঈদের বাস্তবতা।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই চক্র নতুন নয়। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি, মামলা, গ্রেপ্তার—এসব যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ধারাবাহিকতা কি কখনো আমাদের সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যেতে পারবে?
যে দেশে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, সেখানে সহনশীলতাও থাকতে হবে। ভিন্ন মত মানেই শত্রুতা নয়—এটা বোঝার সময় কি এখনো আসেনি? একজন কর্মী শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি হয়রানির শিকার হন, তবে তা শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই একটি অশনিসংকেত।
ঈদ আমাদের শেখায় ত্যাগের শিক্ষা, সহমর্মিতার শিক্ষা, ক্ষমার শিক্ষা। কিন্তু আমরা কি সেই শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছি? যদি ঈদের দিনেও একজন মানুষ ভয়ে পালিয়ে বেড়ান, যদি একজন মা তার সন্তানের জন্য কাঁদেন, যদি একটি পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে—তবে সেই ঈদের আনন্দ কতটা পূর্ণতা পায়?
এই বাস্তবতা শুধু একটি দলের নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। আজ যারা ভুক্তভোগী, কাল তারা ক্ষমতায় গেলে একই চক্র আবার ঘুরতে শুরু করে। ফলে ভোগান্তি কমে না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ছড়িয়ে পড়ে।
এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে ঈদ সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য আনন্দের উৎসবে পরিণত হবে।
আজকের এই দুঃসহ বাস্তবতার মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি। কারণ ইতিহাস বলে—বাংলাদেশের মানুষ প্রতিকূলতা জয় করতে জানে। তারা বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আবারও দাঁড়াবে। হয়তো একদিন আসবে, যখন রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই একই সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবে, কোনো ভয় বা শঙ্কা ছাড়াই।
সেই দিনের প্রত্যাশায়, আজকের এই বেদনার ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানবিকতা চিরস্থায়ী। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি, তবেই এই দুঃসহ ঈদ একদিন সত্যিকার আনন্দের ঈদে রূপ নেবে।
এই কামনাই থাকুক—আগামী দিনের বাংলাদেশ হোক এমন এক দেশ, যেখানে কোনো নেতা-কর্মীকে আর ভয়, মামলা বা হামলার মধ্যে ঈদ কাটাতে না হয়; যেখানে ঈদ মানেই হবে নিখাদ আনন্দ, শান্তি আর ভালোবাসার উৎসব।

