সাংসদ কীর্তি আজাদ সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে কি বললেন
Bengal Times News, 19 March 2026
জগন্নাথ ভৌমিক, বর্ধমান : এলপিজি গ্যাসের সঙ্কট সহ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন কাজে অস্বচ্ছতা ও উন্নয়নে বিলম্ব নিয়ে ফুঁসে উঠলেন বর্ধমান দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ কীর্তি আজাদ। ১৯ মার্চ তৃণমূল কংগ্রেসের পূর্ব বর্ধমান জেলা কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে কীর্তি আজাদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেন। অবকাঠামো উন্নয়নে বিলম্ব, জন প্রকল্পে জবাবদিহিতার অভাব ও রেল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক খোকন দাস, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা দেবু টুডু, বাগবুল ইসলাম, তন্ময় সিংহ রায়, ছাত্র নেতা তথা আইনজীবী স্বরাজ ঘোষ।
বর্ধমান-দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বলেন, 'দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, পশ্চিমবঙ্গের ন্যায্য প্রাপ্য কেন্দ্রীয় তহবিল আটকে রাখা এবং জনকল্যাণ, অবকাঠামো ও শিল্পোন্নয়ন সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছি। যা সম্প্রতি জাতীয় স্তরে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। জানা গেছে, অযোধ্যার রাম মন্দিরে "সীতার রসুই" পর্যাপ্ত এলপিজি গ্যাসের অভাবে বর্তমানে চালু নেই। এছাড়াও, গৃহস্থালী এলপিজি সিলিন্ডারের দামে ৬৫ টাকা বৃদ্ধি দেশের লক্ষ লক্ষ দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর গুরুতর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। কয়েকদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেন যে দেশে কোনো গ্যাস সংকট নেই এবং বিরোধীরা ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। এই বৈপরীত্য একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদি কোনো সংকট না থাকে, তাহলে গ্যাসের জন্য কেন লম্বা লাইন পড়ছে। সাধারণ মানুষকে কেন বারবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বহন করতে হচ্ছে ?'
বর্ধমান দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ কীর্তি আজাদ আরও বলেন, 'প্রতিশ্রুতি এখন ২০৪৭ সালের দিকে সরে গেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা মূল প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। কেন্দ্রীয় সরকার ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গ্রামীণ আবাসন প্রকল্পের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকা পাওনা থাকলেও সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও সেই অর্থ এখনও আটকে রেখেছে। এর ফলে প্রায় ৩২ লক্ষ যোগ্য উপভোক্তা তাদের ন্যায্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতেও মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার নিজস্ব সম্পদ থেকে প্রায় ৩৮,৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গ একাধিক বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে, যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান অন্যতম। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাজ্য সরকার প্রায় ৪৩,৫০০ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চাইলেও মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ অর্থ মঞ্জুর হয়েছে। তবুও রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করেছে।'
সাংসদ কীর্তি আজাদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কটাক্ষ করে বলেন, 'অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের ১০১টি রেল স্টেশন উন্নয়নের জন্য চিহ্নিত করা হলেও গত তিন বছরে মাত্র তিনটিতে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এটি উন্নয়ন কাজের গতি, উদ্দেশ্য এবং বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে পূর্ব বর্ধমান জেলার পালসিটের কাছে জাতীয় সড়ক ১৯-এ একটি অংশ ভেঙে পড়ে। যেখানে নির্মাণের গুণমান, প্রযুক্তিগত তদারকির অভাব, বাস্তবায়নকারী সংস্থার দায়বদ্ধতা এই বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।' তিনি আরও বলেন, 'দুর্গাপুর অঞ্চলে অবস্থিত একাধিক কেন্দ্রীয় সরকারি শিল্প সংস্থা বর্তমানে অচল অবস্থায় রয়েছে। যেমন- হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন লিমিটেড, হিন্দুস্তান অপথ্যালমিক গ্লাস লিমিটেড, ধাতু ও খনিজ বাণিজ্য নিগমের আঞ্চলিক কেন্দ্র, হাজার হাজার একর মূল্যবান জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যদিও এর বিশাল শিল্প সম্ভাবনা রয়েছে। রাজ্য সরকার বারবার অনুরোধ করেছে যে এই সংস্থাগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা হোক অথবা রাজ্য সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হোক, যাতে শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্রীয় সরকার কোনও ক্ষেত্রে সায় দেয়নি। সাংসদ আরও বলেন, এসবের পাশাপাশি, বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশনের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকেও জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং যাত্রী কল্যাণে অবহেলার প্রতিফলন। বর্ধমানের নতুন রোড ওভার ব্রিজের সংলগ্ন ফুট ওভার ব্রিজের কাজ শুরু হলেও তার অগ্রগতি অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও হতাশাজনক। রোড ওভার ব্রিজ উদ্বোধনের চার বছর পরেও পুরনো ওভারব্রিজ-যেটিকে মেরামত করে একটি কার্যকর ফুট ওভার ব্রিজে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল-এখনও অসম্পূর্ণ এবং ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কাজের মধ্যে ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার স্পষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দায়িত্বশীল বাস্তবায়নের পরিবর্তে কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। আমি ১০/১২/২০২৫ তারিখে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম। কিন্তু ২৮.০১.২০২৬ তারিখে রেল প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রেরিত পত্র নং 2025/CE-IV/PQL/49 -এ প্রদত্ত উত্তর বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। বাস্তব পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে প্রতিবেদিত অগ্রগতি এবং যাত্রী ব্যবহার সংক্রান্ত দাবিগুলি প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংসদীয় প্রশ্নের উত্তরে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
এই রকমই একাধিক বিষয় এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থাপন করেছেন বর্ধমান দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ কীর্তি আজাদ।




