থিমের বাহারে বর্ধমানের দুর্গাপুজো : কোথাও ঐতিহ্যের ছোঁয়া, কোথাও ইতিহাস, শিল্পকলা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভিনব মেলবন্ধন
Bengal Times News, 12 October 2026
জগন্নাথ ভৌমিক, বর্ধমান : শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা আর শিউলির সুবাসের সঙ্গে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর আনন্দে মেতে উঠেছে বর্ধমান শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা। পুজোর দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের মন জয় করতে একের পর এক অভিনব থিম, দৃষ্টিনন্দন মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং শিল্পভাবনার সম্ভার নিয়ে হাজির হয়েছে বিভিন্ন পুজো কমিটি। কোথাও ইতিহাসের পাতায় ফিরে দেখার প্রয়াস, কোথাও পুরাণ ও আধ্যাত্মিকতার আবহ, আবার কোথাও সমাজের নানা সমস্যা ও মানবিক অনুভূতির প্রতিফলন—সব মিলিয়ে থিমের বাহারে জমজমাট বর্ধমানের দুর্গোৎসব।
বর্ধমানের দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ সুভাষ অ্যাথলেটিক ক্লাব পরিচালিত অরবিন্দপল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব। তাদের ভাবনা ‘বাহন বন্দে ভারত, ভূস্বর্গে মা’। এই থিমে বন্দে ভারত ট্রেনে চড়ার আনন্দ এবং কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের অনুভূতিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিনব প্রয়াস রয়েছে।
শহরের অন্যান্য পুজো মণ্ডপেও রয়েছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। সর্বমিলন সংঘের ‘এক টুকরো সত্যজিৎ’, বাজেপ্রতাপপুর রেলওয়ে ট্রাফিক কলোনির ‘স্বপ্নালোক’, টিকরহাট সর্বজনীন দুর্গোৎসবের ‘৪৬-এর আর্তনাদ’ এবং আলামগঞ্জ বারোয়ারির ‘ভুবনেশ্বরী মন্দির’—এই থিমগুলির নামেই ফুটে উঠেছে শিল্প, কল্পনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা দিক।
লাল্টু স্মৃতি সংঘের ‘তিরুপতি বালাজি মন্দির’, চৌরঙ্গী ক্লাবের ‘নীল পরীর দেশে’, নজরুলপল্লী বারোয়ারির ‘রুদ্রাক্ষ’ এবং শ্রীপল্লী রিক্রিয়েশন ক্লাবের ‘যোগশক্তি’ দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার জগৎ। বড়শুল ইয়ং মেন অ্যাসোসিয়েশনের ‘লাল কেল্লা’, কিরণ সংঘের ‘জলই জীবন’ এবং কেশবগঞ্জ বারোয়ারির ‘আমি নারী, আমি মহিয়সী’ থিমেও রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। একদিকে দেশের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, অন্যদিকে পরিবেশ সচেতনতা ও নারীশক্তির বার্তা—পুজোর আনন্দের পাশাপাশি এই ভাবনাগুলিও দর্শনার্থীদের ভাবতে শেখায়।
জি টি রোড জোড়া মন্দিরের ‘3D প্রজেকশন লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে ইছলাবাদ ইয়ুথ ক্লাবের ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, পদ্মন্ত্রী সংঘের ‘পুষ্পাঞ্জলি’, শ্যামলাল সর্বজনীনের ‘হর হর মহাদেব’ এবং ন্যাচারাল সিটি আবাসনের দুর্গাপুজোর ভাবনা 'সাবেকায়ানা' ভাবনার মধ্যেই রয়েছে স্মৃতিমেদুরতা, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার আবহ। তবে ন্যাচারাল সিটি'র পুজোর বিশেষত্ব হলো মহিলা পুরোহিত দ্বারা পুজো। উদ্যোক্তাদের দাবি এই ধরনের প্রয়াস বর্ধমানে প্রথম।
কালনাগেট ব্যাঙ্ক পাড়ার ‘অর্ধনারীশ্বর’, পারবীরহাটা নিবেদিতা সংঘের ‘আলোর দিশাই শিল্পকলা’, সবুজ সংঘের ‘দুবাইয়ের স্বামিনারায়ণ টেম্পল’ এবং বিবেকানন্দ সেবক সংঘের ‘ঢাইনা হতে উমা’—বিভিন্ন শিল্পভাবনা ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ার ‘আদিযোগ’ এবং খালুইবিল মাঠের ‘তাণ্ডব’ও দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়ানোর মতো বিষয়।
আমবাগান জাগরণী সংঘের ‘মনস্কামনা’, বাদামতলা দুর্গাপুজা কমিটির ‘আর্তনাদের ইতিকথা’, বুড়ির বাগানের ‘মাতৃঋণ’ এবং ছোটনীলপুর পল্লীমঙ্গল সমিতির ‘ডানার আর্তনাদ’—এই থিমগুলির মধ্যে দিয়ে মানবিক অনুভূতি, সামাজিক উপলব্ধি ও সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। বড়শুল জাগরণীর ‘রঙ্গমঞ্চ’, রানিসায়র উত্তর নেতাজি সংঘের ‘কান তারা’ এবং অন্যান্য পুজো মণ্ডপও নিজেদের ভাবনা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে উৎসবের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে।
এ ছাড়াও বর্ধমানের পুজো মানচিত্রে রয়েছে ছোট বড় এবং এলাকার মন্দিরের অনেক পুজো। এই সব পুজোর পাশাপাশি বর্ধমানে বর্ধমানে বনেদি পরিবারেরও বেশ কয়েকটি পুজো রয়েছে।
দুর্গাপুজো আজ আর শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পীদের সৃজনশীলতা, মণ্ডপ নির্মাণের কারিগরি দক্ষতা, আলোকশিল্পীদের নান্দনিকতা এবং অসংখ্য মানুষের পরিশ্রম। থিমের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পুজো কমিটি থেকে শুরু করে শিল্পী, কারিগর ও স্বেচ্ছাসেবক—সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ উৎসবকে করে তোলে আরও বর্ণময়।
সব মিলিয়ে, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক বার্তার মেলবন্ধনে বর্ধমানের দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যের এক অনন্য আয়োজন। প্যান্ডেল হপিং, বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং শিল্পের নতুন নতুন রূপ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে উৎসবের দিনগুলিতে শহরজুড়ে বইছে আনন্দের স্রোত। থিমের বাহার আর সৃজনশীলতার অভিনবত্বে বর্ধমানের দুর্গোৎসব তাই এ বছরও দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।








