৩০৩ বছরের বনেদি পুজোয় সাবেকিয়ানা, ইতিহাস ও পারিবারিক মিলনের অনন্য মেলবন্ধন
Bengal Times News, 17 October 2026
বেঙ্গল টাইমস নিউজ, পূর্ব বর্ধমান : পুজো আসে, পুজো যায়। সময়ের সঙ্গে বদলায় উৎসবের রীতিনীতি। কিন্তু কিছু বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব আজও বুকে আগলে রেখেছে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও সাবেকিয়ানা। পূর্ব বর্ধমানের সাটিনন্দী গ্রামের পাঁজা বাড়ির দুর্গাপুজো তেমনই এক ইতিহাসের সাক্ষী। এবছর এই পুজো ৩০৩ বছরে পদার্পণ করেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বর্ধমানের রাজাদের আমলেরও পূর্বে এই পুজোর সূচনা। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে দেবী দুর্গার আরাধনা। পুরনো নাটমন্দির ও ঠাকুরদালানের স্থাপত্যে আজও জীবন্ত অতীতের স্মৃতি। লালচে দেওয়াল, সারি সারি স্তম্ভ, প্রশস্ত সিঁড়ি ও খোলা উঠোন মিলিয়ে এই প্রাঙ্গণ যেন বাংলার বনেদি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পাঁজা পরিবারের গৌরবও। ব্যবসা, চিকিৎসা, আইন, প্রশাসন ও ক্রীড়াক্ষেত্রে এই পরিবারের একাধিক সদস্য নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পরিবারের কৃতী সদস্যদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক ডাঃ শিশির কুমার পাঁজা ও ডাঃ সুশীল কুমার পাঁজা, আইনজীবী ভৈরব পাঁজা ও সুবোধকুমার পাঁজা এবং ভারতীয় জাতীয় টেনিস দলের প্রতিনিধি সৌরভ পাঁজা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, যাদবেন্দ্রনাথ পাঁজা ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন।
বর্ধমান শহরের নতুনগঞ্জের বোরহাটে রয়েছে পাঁজা পরিবারের প্রাচীন আদি বাড়ি। সাটিনন্দীর বাড়ি পরিবারের কাছে পরিচিত ‘দেশের বাড়ি’ নামে। কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকলেও দুর্গাপুজোর ক’টা দিন সবাই ফিরে আসেন এই বাড়িতে। ফলে দেবী আরাধনার পাশাপাশি এই উৎসব হয়ে ওঠে পারিবারিক পুনর্মিলনের এক বিশেষ উপলক্ষ।
পাঁজা বাড়ির প্রতিমায়ও রয়েছে সাবেকি বনেদিয়ানার ছাপ। সাদা শোলার কারুকাজ, ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ ও পরিচিত প্রতিমার বিন্যাসে ফুটে ওঠে বাংলার চিরাচরিত দুর্গাপুজোর আবহ। আধুনিক থিমের চাকচিক্যের বদলে পুরনো রীতিকে ধরে রাখাই এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পুজোর প্রস্তুতিতে বিশেষ গুরুত্ব পায় পুরনো কাঁসা ও তামার বাসন, ঠাকুরদালান সাজানো এবং ভোগ ও পারিবারিক ভোজের আয়োজন। একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া, আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং গ্রামের মানুষের উৎসাহ—সব মিলিয়ে এই পুজো পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাটিনন্দী গ্রামেরও এক বড় উৎসবে পরিণত হয়।
আধুনিকতার প্রবল স্রোতেও সাটিনন্দীর পাঁজা বাড়ির দুর্গোৎসব মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অমূল্য সম্পদ। তিন শতাব্দীর ইতিহাস, সাবেকি প্রতিমা, প্রাচীন স্থাপত্য ও পারিবারিক বন্ধনের মেলবন্ধনে পাঁজা বাড়ির পুজো আজও বাংলার বনেদি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

