তারাশঙ্কর-মহাশ্বেতার স্মরণসভা, সঙ্গে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করার দাবি পূরণের আনন্দ
লুতুব আলি, কলকাতা : সরকারি কাজে বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ধন্যবাদ জানাল পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য মঞ্চ। সংগঠনের সম্পাদক চন্দ্রনাথ বসু বলেন, মাতৃভাষার এই সরকারি স্বীকৃতি প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাবে।
বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই কলকাতার কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হলে পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য মঞ্চের উদ্যোগে মহাসমারোহে পালিত হল দুই কালজয়ী সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বংশধর ও গবেষক সপ্রতিভ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ আকবর আলি সাহ।
আবেগঘন মুহূর্তে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মভূমির পবিত্র মাটি বিশিষ্ট সাহিত্যিক ডঃ সমুদ্র বসুর হাতে তুলে দেন সংগঠনের সম্পাদক চন্দ্রনাথ বসু। সকল অতিথিকে ফুল ও উত্তরীয় দিয়ে বরণ করেন চেয়ারম্যান সঙ্গীতা বসু রায় ও সভাপতি রঞ্জনা গুহ।
অনুষ্ঠানে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মানে ভূষিত হন ডঃ সোমালি চৌধুরী, জয়দীপ রায়চৌধুরী, শ্যামল কুমার বিশ্বাস, তাপস ভূষণ সেনগুপ্ত, দেবরাজ সাহা ও পুলক সাহা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি স্বর্ণ সম্মান প্রদান করা হয় সুজিত কুমার পালকে।
শতবর্ষে আলোকপাত
আলোচনা পর্বে ডঃ সমুদ্র বসু ও ডঃ অলকানন্দা গোস্বামী দুই সাহিত্যিকের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। বক্তারা বলেন, ২০২৬ সাল দুই মহীরুহের জন্মশতবর্ষের বছর। একশো বছর আগে জন্ম নেওয়া তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর "গণদেবতা", "কালিন্দী", "আরোগ্য নিকেতন"-এর মধ্যে দিয়ে বাংলার গ্রাম-জীবন, লোকসংস্কৃতি ও মানুষের লড়াইকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে মহাশ্বেতা দেবী তাঁর "হাজার চুরাশির মা", "অরণ্যের অধিকার"-এর মতো রচনায় সমাজের প্রান্তিক মানুষ, আদিবাসী ও বঞ্চিতদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
শতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাঁদের সাহিত্য শুধু পাঠ্য বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। তারাশঙ্করের মানবিকতা ও মহাশ্বেতার প্রতিবাদ আজও যুবসমাজকে পথ দেখায়। এই শতবর্ষ উদযাপনের মূল লক্ষ্যই হল নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের আদর্শ, চিন্তা ও সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়া। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী এক বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই দুই সাহিত্যিককে নিয়ে পাঠচক্র, নাটক ও আলোচনাসভার আয়োজন করা হবে।
সাংস্কৃতিক পর্বে ডঃ দীপা দাসের "খোলা জানালা"-র শিল্পীরা রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। উপস্থিত ছিলেন অভিযান বন্দ্যোপাধ্যায়, বনানী শিকদার, চন্দ্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জনা কর্মকার, বিলু দোলুই, সোনালী ঘোষ, শিবানী কুন্ডু সাহা প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি শিব শংকর বক্সি। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান সঙ্গীতা বসু রায়।
শেষে চন্দ্রনাথ বসু বলেন, সরকারি দপ্তরে বাংলা চালু হলে গ্রাম-বাংলার মানুষ আর ভাষার কারণে বঞ্চিত হবেন না। এই সিদ্ধান্ত তারাশঙ্কর-মহাশ্বেতার মতো সাহিত্যিকদের ভাষাচেতনার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।



