Batukeshwar Dutta মহান বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত
🟠 প্রতনু রক্ষিত
Bengal Times News, 20 July 2026
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বটুকেশ্বর দত্ত এক অমর নাম। তিনি ছিলেন এমন একজন সাহসী বিপ্লবী, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন, যৌবন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন। ভগৎ সিংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বটুকেশ্বর দত্ত ১৯১০ সালের ১৮ নভেম্বর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার ওঁয়াড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গোষ্ঠ বিহারী দত্ত এবং মাতার নাম কমলা কামিনী দেবী। পিতা কর্মসূত্রে উত্তরপ্রদেশের কানপুরে কর্মরত থাকায় বটুকেশ্বরের শৈশব ও শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময় কানপুরে কাটে। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। দেশপ্রেমমূলক সাহিত্য পাঠ, শরীরচর্চা এবং সমসাময়িক স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনাবলি তাঁর মনে গভীর দেশপ্রেমের জন্ম দেয়।
কৈশোরেই তিনি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন -এ যোগ দেন। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় চন্দ্রশেখর আজাদ, ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরু, যতীন্দ্রনাথ দাস প্রমুখ বিপ্লবীদের সঙ্গে। তাঁদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। সংগঠনের গোপন বৈঠক, প্রচারকাজ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে লাহোরে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার জন স্যান্ডার্স হত্যার পর ভগৎ সিংকে গ্রেফতারের জন্য ব্রিটিশ সরকার সর্বত্র তল্লাশি শুরু করে। সেই সময় বটুকেশ্বর দত্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ভগৎ সিংকে নিজের জন্মভূমি পূর্ব বর্ধমানের ওঁয়াড়ি গ্রামে নিয়ে আসেন। প্রথমে ভগৎ সিং বটুকেশ্বর দত্তের পৈতৃক বাড়িতে আত্মগোপন করেন। পরে ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারি বেড়ে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে পাশের নগেন্দ্রনাথ ঘোষের বাড়ির গোপন পাতালঘরে স্থানান্তর করা হয়। স্থানীয় ঐতিহাসিক বিবরণ ও সংরক্ষণ ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ভগৎ সিং সেখানে প্রায় ১৫ দিন আত্মগোপন করে ছিলেন। এই সময়ে বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগৎ সিং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন এবং পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশও এই সময়ে প্রস্তুত হয় বলে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগৎ সিং দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় ব্রিটিশ সরকারের দমনমূলক পাবলিক সেফটি বিল ও ট্রেড ডিস্পিউট বিলের প্রতিবাদে দুটি স্বল্পক্ষমতার বোমা নিক্ষেপ করেন। এই বোমার উদ্দেশ্য ছিল না কোনো প্রাণহানি ঘটানো; বরং ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় আইন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলা এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
বোমা বিস্ফোরণের পর তাঁরা পালিয়ে না গিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন। আদালতকে তাঁরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন এবং "ইনকিলাব জিন্দাবাদ" ও "সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক" ধ্বনি দিয়ে স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে দেন। এই ঘটনা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে এবং অসংখ্য তরুণকে বিপ্লবী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করে।
বিচারে বটুকেশ্বর দত্তের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড হয় এবং তাঁকে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে (কালাপানি) পাঠানো হয়। সেখানে তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অনশন করেন এবং বন্দিদের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যান। জেলের কঠোর নির্যাতন তাঁর শরীরকে দুর্বল করলেও তাঁর মনোবল কখনও ভাঙতে পারেনি।
১৯৩৮ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং পুনরায় কারাবরণ করেন। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য এক নিরলস আত্মত্যাগের ইতিহাস।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বটুকেশ্বর দত্ত কোনো সরকারি পদ বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেননি। দীর্ঘ কারাবাস ও নির্যাতনের ফলে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং তিনি আর্থিক কষ্টের মধ্যেও সাধারণ জীবনযাপন করেন। স্বাধীনতার জন্য অসামান্য অবদান থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষদিকে তিনি প্রায় উপেক্ষিত ছিলেন। ১৯৬৫ সালের ২০ জুলাই দিল্লিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পাঞ্জাবের হুসেনিওয়ালায় শহিদ ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর সমাধির পাশেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
বটুকেশ্বর দত্ত ছিলেন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। বর্ধমানের ওঁয়াড়ি গ্রামে ভগৎ সিংকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় আইনসভায় ঐতিহাসিক প্রতিবাদ, দীর্ঘ কারাবাস এবং স্বাধীনতার জন্য অবিচল সংগ্রাম—তাঁর সমগ্র জীবন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গৌরবময় অধ্যায়। তাঁর আদর্শ, সাহস ও আত্মত্যাগ আজও দেশের যুবসমাজকে দেশপ্রেম ও মানবসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে।

